খুলনা-২ আসনের জামায়াত প্রার্থীর কাছে বাপা’র কেন্দ্রীয় সুপারিশমালা পেশ
খুলনা প্রতিনিধি:
পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশবান্ধব অঙ্গীকার সংযোজনের দাবিতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর কেন্দ্রীয় সুপারিশমালা খুলনা-২ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের নিকট পেশ করা হয়েছে।
সোমবার খুলনায় অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময়কালে বাপা’র পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিবেশ সংকট এখন আর শুধু প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জনস্বাস্থ্য, জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা ও নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জাতীয় পরিষদ সদস্য ও খুলনা শাখার সমন্বয়কারী, বিশিষ্ট নাগরিক নেতা ও পরিবেশবিদ, খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব মানবতাবাদী অ্যাডভোকেট মোঃ বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন,
“পরিবেশ ধ্বংসের ফলে মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, নদী-নালা মরে যাচ্ছে, উপকূল ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাহসী সিদ্ধান্ত জরুরি।”
বাপা খুলনা শাখার নির্বাহী সদস্য এবং আইন ও অধিকার বাস্তবায়ন ফোরামের খুলনা বিভাগীয় সভাপতি নাগরিক নেতা এস এম দেলোয়ার হোসেন বলেন,
“পরিবেশ রক্ষা এখন বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দায়িত্ব। নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশকে অগ্রাধিকার না দিলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।”
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কবি নাজমুল তারেক তুষার, যিনি পরিবেশ সংকটকে মানবিক ও সাংস্কৃতিক সংকট হিসেবেও বিবেচনার আহ্বান জানান।
এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) যৌথভাবে দেশের পরিবেশ রক্ষায় রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বাপা’র কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, নির্বাচনী অঙ্গীকারের কেন্দ্রে পরিবেশকে আনতে না পারলে উন্নয়নের সব অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তাঁরা বায়ু দূষণ, নদী ও জলাশয় দখল ও দূষণ, কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, জলাবদ্ধতা, উপকূল সুরক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর, বনাঞ্চল রক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং গণপরিবহনভিত্তিক উন্নয়নকে নির্বাচনী ইশতেহারের মূল অঙ্গীকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
বাপা’র সংক্ষিপ্ত দাবিসমূহ:
১. বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ: ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণখাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও দূষণমুক্ত সিমেন্ট উৎপাদন।
২. কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্লাস্টিকসহ বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্কাশন।
৩. তরল বর্জ্য ও জলাশয় দূষণ রোধ: শিল্পকারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলক ও নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা বন্ধ।
৪. নদ-নদী দখল ও অবক্ষয় রোধ: বেড়িবাঁধ ও স্লুইসগেটের ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত।
৫. জলাবদ্ধতা নিরসন: নদীপথ উন্মুক্ত ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা।
৬. উপকূল রক্ষা: পোল্ডার বাঁধকে অষ্টমাসী বাঁধে রূপান্তর ও পলিপতন পুনরুদ্ধার।
৭. ন্যায্য পানি হিস্যা: আন্তর্জাতিক আইন (জাতিসংঘ ১৯৯৭ সনদ) কার্যকর প্রয়োগ।
৮. তিস্তা রক্ষা: বিদেশি পরিকল্পনার পরিবর্তে দেশীয় ও টেকসই রূপরেখা বাস্তবায়ন।
৯. নবায়নযোগ্য জ্বালানি: কয়লার বদলে সৌরসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং রামপাল প্রকল্প গ্যাসে রূপান্তর।
১০. বনাঞ্চল সংরক্ষণ: বন উজাড় বন্ধ, বন পুনরুদ্ধার ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার নিশ্চিত।
১১. পরিকল্পিত নগরায়ন: জাতীয় ভৌত পরিকল্পনা ও ‘স্বস্থানে নগরায়ন’ মডেল বাস্তবায়ন।
১২. যানজট নিরসন: ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন, রেল ও নৌপথ উন্নয়ন।
বাপা নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক দলগুলো পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গঠনে এই সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে বাস্তবসম্মত পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার যুক্ত করবে।